সৌদি থেকে মাসে ২০০ নির্যাতিত নারী কর্মী ফিরছেন

0
551

টুডে বাংলা ২৪: ভাগ্য বদলের আশায় গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরব গিয়ে শনিবার রাতে হুইল চেয়ারে ফিরে এসেছেন নারায়ণগঞ্জের জহুরা। টানা দুই বছর কঠোর পরিশ্রম করেও পাননি ন্যায্য পারিশ্রমিক। একটি পরিবারের জন্য কাজ করার কথা থাকলেও তিন স্থানে কাজ করতে হয়েছে তাকে। পেয়েছেন মাসে মাত্র ১২ হাজার টাকা। বেতন বাড়ানোর কথা বললেই হয়েছেন শারীরিক নির্যাতনের শিকার। শেষে সইতে না পেরে পালিয়ে বেঁচেছেন। আশ্রয় নিয়েছেন দূতাবাসের সেফহোমে। চিকিৎসা শেষে এখনো হাঁটতে পারেন না। তাই বাধ্য হয়েছেন হুইল চেয়ারে বিমানে উঠতে।

শুধু জহুরা নয় সৌদি আরব থেকে নির্যাতিতা নারী শ্রমিকদের ফেরত আসার যেন ঢল নেমেছে। গত তিন দিনে দুই শতাধিক নির্যাতিত বাংলাদেশি নারী ফেরত এসেছেন অনিরাপদ সৌদি আরবের কর্মক্ষেত্র থেকে। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত মাসে গড়ে প্রায় ২০০ জন করে নারী কর্মী সৌদি আরব থেকে ফিরে এসেছেন। তাদের অনেকেই ফিরে যৌন নির্যাতন থেকে শুরু করে নানা ধরনের শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। ফেরত আসার আগে নিয়োগকর্তার বাড়ি থেকে পালিয়ে বা বিতাড়িত হয়ে তাদের প্রত্যেকেই এতদিন ছিলেন সেফহোমে। পাসপোর্টও ছিল না অনেকেরই। দূতাবাস থেকে দেওয়া ট্রাভেল আউটপাসে এসেছেন দেশে।

ফেরত আসা মানসুরা বেগমের ভাষ্য, আমার পাসপোর্টসহ মান-সম্মান সব দিয়ে এসেছি। পালিয়ে এসে বাঁচতে পেরেছি এটাই বেশি। রবিবার ঢাকায় বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর হুইল চেয়ারে বসে জহুরা জানান, লাখ টাকা বেতনের কথা বলে আমাকে পাঠানো হলেও গিয়ে দেখি চক্রের কাছে আমাকে বিক্রি করা হয়েছে। এলাকার দালাল থেকে শুরু করে সৌদি আরবের কথিত নিয়োগকর্তা সবাই এর অংশে। সৌদি পৌঁছানোর পর থেকেই নির্যাতন শুরু হয়। আমাকে পঙ্গু বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। শনিবার আসা মল্লিকা জানান, সৌদি আরবে প্রতিনিয়ত তাকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তাকে আটকে রেখে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার পাশাপাশি রড গরম করে ছেঁকা পর্যন্ত দেওয়া হয়।

ফেব্রুয়ারিতে ফেরত আসা খুলনার পারভিনের বক্তব্য, দালালের সঙ্গে যে কাজের কথা বলে গিয়েছিলাম তার ধারেকাছেও কোনো কাজ দেওয়া হয়নি। মাত্র ৫০০ সৌদি রিয়াল বেতনে কাজ দেওয়া হয়। ঘুমের সময়টুকুও দেওয়া হয়নি। কাজ করতে গিয়ে তিনি প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন কিন্তু তার কোনো চিকিৎসা করানো হয় না। অসহ্য হয়ে অনেকবার আত্মহত্যার কথাও ভাবেন তিনি। কিন্তু কলেজপড়ুয়া মেয়ের দিকে তাকিয়ে মনকে শক্ত করেন। আর ভাবেন সৌদিতে থাকলে আত্মহত্যার প্রয়োজন নেই, সে এমনিতেই মারা যাব। শেষে পালিয়ে আশ্রয় নেন দূতাবাসে।

বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়, দুই বছরের চুক্তিতে গেলেও মাত্র ১১ মাস পরে গত শনিবার খালি হাতে (সৌদি আরব থেকে) দেশে ফিরে এসেছেন সুনামগঞ্জের তাসলিমা আক্তার। তাসলিমা বলেছেন, অনেক আশা নিয়ে ওই দেশে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম তেমন কিছু না। দালাল বলেছিল, সেখানে গেলে ২০ হাজার টাকা দেবে, মোবাইল দেবে, কথা বলতে দেবে, কাপড়-চোপড় সাবান তেল সবকিছু ফ্রি। কিন্তু আসলে তেমন কিছু না, ঠিকমতো বেতন দেয় না, নিজের গাঁট থেকে টাকা দিয়ে সবকিছু কিনতে হয়। তার ওপর আমার প্রায় আট মাসের বেতন বাকি। বেতন চাইলে বলে তোর আকামা হয়নি, আকামা করাতে আড়াই লাখ টাকা লাগবে। এ রকম অনেক কিছু বলে বোঝাত। তাসলিমা বলেন, আমি নিয়োগকর্তা মহিলাকে বলেছিলাম, সাত-আট মাস বাড়িতে টাকা পাঠাইনি, বেতন দেন। সে আমার গায়ে হাত তোলে। তখন আমি পুলিশকে ফোন করি। পুলিশ আমাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে দেখি অনেক মেয়ে। অনেককে মেরেছে, কারও হাত ভেঙেছে, কারও পা ভেঙেছে, কারও গায়ে গরম পানি দিয়েছে, অনেক রকম নির্যাতন করেছে। কোনো কোনো মেয়েকে নিয়োগদাতার ছেলেরা খারাপ নির্যাতন করেছে। কাউকে কাউকে এক দেড় বছর খাটিয়ে বেতন দেয়নি। আমি এগারো মাস থেকেছি, পরনের কাপড়টাও ঠিকমতো দেয়নি। তাসলিমা আক্তার বাংলাদেশ দূতাবাসে ছিলেন চার মাস। এখন দেশে ফিরেছেন। (সূত্র: বিবিসি ও বাংলাদেশ প্রতিদিন)

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here